back to top

অপহরণ মামলার আসামি ৭ বছরের শিশু, আদালত ঘিরে চাঞ্চল্য

প্রকাশিত: ০৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১৭:৩৭

চট্টগ্রামে চার বছরের এক শিশুকে অপহরণের অভিযোগে ৭ বছর বয়সী আরেক শিশুকে আদালতে প্রেরণ করেছে পুলিশ।

এর আগে গত শুক্রবার নগরীর ষোলশহর এলাকা থেকে ওই শিশু ও তার মাকে গ্রেপ্তার করে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। শুধু তাই নয়, ৭ বছরের ওই শিশু ও তার মাকে ওইদিনই আদালতে প্রেরণ করা হয়।

তার মাকে কারাগারে পাঠিয়ে শিশুটিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালক) পাঠিয়ে দেন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

অথচ শিশু আইন অনুযায়ী, ৯ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু আসামি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আইনে না থাকলেও চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে গত ১৩ এপ্রিল।

জানাজানি হয় রবিবার। এর পর থেকে আদালত ও নগর পুলিশে তোলপাড় চলছে। শিশুটি বর্তমানে গাজীপুরের টঙ্গীতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালক) রয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, গত ১৩ এপ্রিল আনোয়ারা বেগম নামে এক নারীর দুই সন্তানের মধ্যে বড় সন্তান অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সঙ্গে নিয়ে যান তার ৪ বছরের ছোট সন্তান মো. রামিমকেও। কিন্তু রামিম সেখান থেকে হারিয়ে যায়।

এ ঘটনায় ষোলশহর রেলস্টেশন এলাকায় বসবাস করা আনোয়ারা বেগম পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

অনেক খোঁজাখুঁজির পরও রামিমকে না পেয়ে ঘটনার ৭ মাস পর গত শুক্রবার আনোয়ারা বেগম পাঁচলাইশ থানায় অপহরণ মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় আইনের সংস্পর্শে নেওয়া ৭ বছরের শিশুটি ও তার ৩০ বছর বয়সি মাকে।

এতে বলা হয়, বাদী জানতে পারেন, তার ছেলেকে হাসপাতালের বারান্দা থেকে ৭ বছরের ওই শিশু ও তার মা খেলার কথা বলে অপহরণ করে নিয়ে যান।

মামলা হওয়ার পর ওই দিনই পাঁচলাইশ থানার এসআই এনামুল হক ষোলশহর এলাকা থেকে ৭ বছরের শিশু ও তার মাকে গ্রেপ্তার করে। তবে রামিমকে উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

ওইদিনই শিশুটিকে ও তার মাকে আদালতে পাঠিয়ে দেয় পুলিশ। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত শিশুটির মাকে কারাগারে এবং শিশুটিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালক) পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আদালত পাড়ায় এ ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হরে রবিবারই গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয় মামলার বাদী আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, তাঁর চার বছরের শিশুর এখনো খোঁজ পাননি।

সাত বছরের শিশু কীভাবে অপহরণ কর‍ল জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, একজনের কাছ থেকে জানতে পারেন শিশুটি ও তার মা অপহরণে জড়িত।

এই প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল–৭ এর পিপি শফিউল মোরশেদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘শিশু আইন ও দণ্ডবিধিতে ৯ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া, গ্রেপ্তার কিংবা আটকের সুযোগ নেই। আদালতের আদেশের নথি, মামলা এজাহারে বাদী শিশুটির বয়স সাত উল্লেখ করেছেন।’

তবে শিশুটির জন্মনিবন্ধন সনদ আছে কিনা জানা না গেলেও আদালতের আদেশের নথি, মামলা এজাহারে বাদী শিশুটির বয়স সাত উল্লেখ করেছেন। শিশুটির বাবারও দাবি, ছেলেটি বয়স সাত।

আইনে না থাকলেও কেন সাত বছরের শিশুর বিরুদ্ধে থানায় মামলা গ্রহণ ও আইনের সংস্পর্শে নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অমিতাভ দত্ত আজ রোববার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নেওয়ার সুযোগ নেই।’ তারপরও এ রকম কেন হয়েছে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

অপরদিকে কোনো শিশু আসামি হলে তাকে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে হয়। কিন্তু চলতি ডিসেম্বরের শুরু থেকে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামের নিম্ন আদালতেও চলছে মাসব্যাপী অবকাশ।

ফলে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এই সময় এ–সংক্রান্ত মামলা চলবে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে। তবে শুক্রবার শিশুটিকে আদালতে নেওয়া হলেও এজলাসে হাজির করা হয়নি।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, রবিবার বিকেলে দেওয়া এক আদেশে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ মো. হাসানুল ইসলাম উল্লেখ করেন, শিশু আইন ২০১৩–এর ৪৪ (১) ধারা মতে, ৯ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে গ্রেপ্তার ও আটকের সুযোগ নেই।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মফিজুল হক ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বলেন, আদালতে শিশুটিকে আনা হলেও এজলাসে হাজির করা হয়নি। বিচারকের সই করা অন্তর্বর্তীকালীন পরোয়ানায় টঙ্গীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মফিজুল হক ভূঁইয়া আরও বলেন, বিষয়টি জানার পর রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আজ আদালতে শিশুটির জামিনের আবেদন করা হয়। আদালত তা মঞ্জুর করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিশুটির বাবা একটি চায়ের দোকানে চাকরি করেন। মামলার বাদীও তাঁদের প্রতিবেশী।

জানতে চাইলে শিশুটির বাবা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সাত মাস আগের ঘটনায় আমার স্ত্রী ও সাত বছরের শিশুকে কেন আসামি করেছে, বুঝতেছি না।’ তাঁর অভিযোগ, পুলিশ বাদীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাঁর ছেলেকে আসামি করেছে।

আদালত তোলপাড় করা ঘটনার বিষয়ে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা যাচাই–বাছাই করছি। এরপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে এ ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুস সাত্তার।

তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ভুলে হয়তো মামলা নিল, কিন্তু আইনের সংস্পর্শে নিয়ে আদালতে কীভাবে পাঠাল। ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এ ধরনের ঘটনা পুলিশ বারবার করবে।