back to top

এনসিপিতে দীর্ঘ হচ্ছে পদত্যাগের তালিকা,কিন্তু কেন?

প্রকাশিত: ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৫:১৯

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অভ্যন্তরে চলমান অস্থিরতা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।

নীতিগত ও আদর্শিক কারণ দেখিয়ে এবং সামাজিক যেগাযোগ মাধ্যমে নানান প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে একের পর এক নেতা-নেত্রীরা দল ছাড়ছেন। রীতিমত হিড়িক পড়েছে পদত্যাগের।

আবুল কাশেম
সবশেষ ফেনী–৩ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী আবুল কাশেম দলটির সব পদ ও প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

নীতিগত কারণে তিনি এনসিপি থেকে পদত্যাগ এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

গতকাল রোববার (২৮ ডিসেম্বর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার পর ফেনীর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

ফেসবুক পোস্টে আবুল কাশেম বলেন, ‘নীতিগত কারণে আমি জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে পদত্যাগ ও নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রিয় ফেনী–৩ এর এলাকাবাসী, আমার সালাম গ্রহণ করবেন।

আমি আজ আপনাদের জানাতে চাই, আমি জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি না এবং একই সঙ্গে এই দল থেকে পদত্যাগ করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপি যে রাজনৈতিক সমঝোতা ও অবস্থান গ্রহণ করেছে, তা তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সে কারণেই পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

আবুল কাশেম বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয় এবং কোনো ধরনের দ্বন্দ্বের ফলও নয়। মতাদর্শগত ভিন্নতার কারণে আলাদা হওয়াকেই আমি সঠিক ও দায়িত্বশীল পথ বলে মনে করেছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির ফেনী জেলা আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম সৈকত বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি এখনো অবগত নই। আমাদের কাছে তার লিখিত কোনো পদত্যাগপত্র এখন পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

জামায়াতের সঙ্গে যদি রাজনৈতিক জোট চূড়ান্ত হয়, তাহলে ফেনীর কোনো আসনে এনসিপির আলাদা প্রার্থিতা থাকার দাবি নেই। সে ক্ষেত্রে জোটের প্রার্থীই আমাদের প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবে।’

ভাসানীর নাতি আজাদ খান ভাসানী
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দলটির কৃষক উইং এর প্রধান সমন্বয়কারী ও মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নাতি আজাদ খান ভাসানী।

রোববার রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এক পোস্টে তিনি এ কথা জানান।

ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, ‘অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের হাত ধরে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-তে আমি যুক্ত হয়েছিলাম।

শুরু থেকেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে মহান মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত লড়াইয়ের এক ধারাবাহিক অধ্যায় হিসেবে আত্মস্থ করেছি।

তেপ্পান্ন বছরের পুঞ্জীভূত বৈষম্য, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখাই ছিল আমার সেই পথচলার প্রেরণা।’

তিনি আরও বলেন, ‘মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর দেখানো গণমানুষনির্ভর, আধিপত্যবাদ-সাম্রাজ্যবাদ ও বৈষম্যবিরোধী পালনবাদী রাজনীতির স্বপ্ন থেকেই প্রথমে জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর সঙ্গে যুক্ত হই।

সেই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় দলের কৃষক উইংয়ের প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্বও গ্রহণ করি।’

‘কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, বাস্তব অভিজ্ঞতায় নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা, গণমানুষের প্রতি দরদ ও ত্যাগের যে গভীরতা প্রয়োজন এখানে তার স্পষ্ট ঘাটতি আমি অনুভব করেছি।

নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত সাফল্য দেখা যায়নি।’

মওলানা ভাসানীর নাতি বলেন, ‘এই বাস্তবতায় বেশ কিছুদিন ধরে সরাসরি সক্রিয় না থেকেও দলটির সঠিক রাজনীতি ও সাফল্য কামনা করে গেছি। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক আদর্শের পক্ষাবলম্বনই আমার কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সেই দায় ও আদর্শের প্রতি অবিচল থাকতেই আজ জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর সঙ্গে আমার আনুষ্ঠানিক সম্পর্কচ্ছেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি।’

তিনি বলেন, ‘এনসিপির সঙ্গে আমার এই স্বল্পকালীন পথচলায় কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।

তারুণ্যের অভিযাত্রী দলটির প্রতি রইলো আন্তরিক শুভকামনা। গণমানুষের রাষ্ট্র বিনির্মাণের সংগ্রামে তারা যেন সঠিক পথ খুঁজে পায় এই প্রত্যাশাই থাকলো।’

এর আগে এ বছরের গত ৬ সেপ্টেম্বর এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর অনুমোদনক্রমে কৃষক উইংয়ের প্রস্তুতি কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে প্রধান সমন্বয়কারী করা হয়েছিল আজাদ খান ভাসানীকে।

অ্যাডভোকেট মনজিলা সুলতানা ঝুমা
গতকাল রোববার (২৮ ডিসেম্বর) দিবাগত রাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টের মাধ্যমে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী অ্যাডভোকেট মনজিলা সুলতানা ঝুমা।

গতকাল রোববার (২৮ ডিসেম্বর) দিবাগত রাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টের মাধ্যমে তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে নিজের সিদ্ধান্ত অবহিত করেছেন।

মনজিলা সুলতানা ঝুমা এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। খাগড়াছড়ি আসন থেকে এনসিপির ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে তার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা ছিল।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলের সঙ্গে হওয়া আসন সমঝোতায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়েও আলোচনা শোনা যাচ্ছিল।

ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, এনসিপি প্রাথমিকভাবে যেই ১২৫ আসনে মনোনয়ন দিয়েছিল, তার মধ্যে খাগড়াছড়ি ২৯৮নং আসনে শাপলা কলি মার্কা নিয়ে নির্বাচন করতে আমাকে মনোনীত করেছিল। ২৪ তারিখে আমার পক্ষে আমার দলের খাগড়াছড়ি জেলার আহ্বায়ক মনোনয়ন উত্তোলন করেছে।

তিনি আরও লেখেন, আগামীকাল জমা দেওয়ার লাস্ট ডেট। আজ প্রায় ২ ঘণ্টা আগেই দলের আহ্বায়ক জনাব নাহিদ ইসলামকে আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছি। আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি না।

ফেসবুক পোস্টে তার দাবি, আজ অথবা কাল তরুণরাই সংসদে যাবেন—এমন বিশ্বাস তিনি রাখেন।

নুসরাত তাবাসসুম
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম নির্বাচনকালীন সময়ে দলটির সব কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

রোববার (২৮ ডিসেম্বর) রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া ‘আমি খুব সংক্ষেপে কিছু বিষয় জানাতে চাই’ শিরোনামের এক পোস্টে তিনি এ তথ্য জানান।

নুসরাত তাবাসসুমের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

আমি খুব সংক্ষেপে কিছু বিষয় জানাতে চাই। এনসিপি তার জন্মলগ্নে আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছে, গণতন্ত্রের সুষম চর্চা, নয়া বন্দোবস্ত, মধ্যপন্থা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থা, সভ্যতা কেন্দ্রিক সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ এবং সর্বোপরি বাংলাদেশপন্থা নিয়ে।

এই প্রতিটা শব্দ আমি আমার মননে, মগজে এবং যাপনে ধারণ করি, এই শব্দ গুলো আমার রাজনৈতিক স্বপ্ন। এনসিপির ঘোষণাপত্র থেকে শুরু করে এর সবগুলো লিটারেচার এই বক্তব্য ধারণ করে৷ এনসিপি গঠনের সময় এটি ঠিক তাই ছিল যা আমি চেয়েছিলাম।

আজ ২৮/১২/২০২৫, ঠিক ১০ মাস পর জামায়াতে ইসলামী সহ ১০ দলীয় জোটে বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে অংশগ্রহণের মাধ্যমে, আমি মনে করি এনসিপির সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দ এবং নীতিনির্ধারকেরা নিজেরাই এনসিপির মূল বক্তব্য থেকে চ্যূত হয়েছেন।

বিশেষ করে, বিভিন্ন সময়ে আহ্বায়ক মহোদয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীলদের আমরা ৩০০ আসনে প্রার্থী প্রদান করার ঘোষণা দিতে শুনেছি।

এমতাবস্থায় তৃণমূল পর্যন্ত বিশেষ করে মনোনয়ন নেয়া ব্যক্তিগণের সাথে এই জোট ঘোষণার মাধ্যমে প্রবঞ্চনা করা হয়েছে বলে মনে করি।

এ সমস্ত ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে আমি নুসরাত তাবাসসুম, (যুগ্ম আহ্বায়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি) নিজেকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচনকালীন সময়ে পার্টির সকল কার্যক্রম থেকে নিষ্ক্রিয় করছি। এবং অবস্থা পুনর্বিবেচনা ক্রমে যে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘোষণা করছি।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক পদত্যাগ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি সমর্থন জানান।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা ও তার স্বামী এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ এবং রোববার (২৮ ডিসেম্বর) যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনুভা জাবিন পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

উল্লেখ্য, গত কয়েক দিনে এনসিপির একাধিক নেত্রী দলটি থেকে পদত্যাগসহ নির্বাচনে না দাঁড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তাতে দলের ভেতর স্পষ্টই বিভাজন দেখা দিয়েছে বলেই মত বিশ্লেষকদের।