তীব্র শীতের রাতে অসুস্থ দুই সন্তানকে সড়কের পাশে রেখে যাওয়া ছোট্ট ভাই-বোনের আর কখনো দেখা হবে না।
চার বছর বয়সী বোন আয়শা আক্তার বুক দিয়ে আগলে রাখলেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা যায়নি ১৪ মাস বয়সী ছোট ভাই মোরশেদকে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেল তিনটার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছোট শিশুটি মারা যায়।
গত ২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের মাজারগেট এলাকায় সড়কের পাশে কাঁপতে থাকা দুটি শিশুকে দেখতে পান অটোরিকশাচালক মহিম উদ্দিন।
এ সময় কনকনে শীতে শিশু আয়েশা আক্তার তার ভাইকে আগলে ধরে রাখতে দেখা যায়।
চার বছর বয়সী কন্যা শিশু ও ১৪ মাস বয়সী বাকপ্রতিবন্ধি ছোট ভাই মোরশেদকে উদ্ধার করে মানবিক তাড়নায় নিজের বাড়িতে নিয়ে আশ্রয় দেন মহিম।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনা মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে শিশু দুটির দায়িত্ব গ্রহণ করে। উদ্ধারের সময় ছেলেশিশুটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল।
গত মঙ্গলবার দুপুরে ওই দুই শিশুকে নিয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের কাছে যান আনোয়ারার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার।
জেলা প্রশাসক তাদের চিকিৎসা ও যাবতীয় খরচের দায়িত্ব নিয়ে দুই শিশুর মধ্যে মেয়েশিশুটিকে অটোরিকশাচালক মহিম উদ্দিনের জিম্মায় তুলে দেন।
গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় দুই বছর বয়সী ছেলেশিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে এক সপ্তাহের মাথায় তার মৃত্যু হল।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার গণমাধ্যমকে জানান, মারা যাওয়া শিশুটির লাশ নিতে তার দাদি চট্টগ্রামে এসেছেন।
মানিকছড়ির ইউএনওর সঙ্গে কথা বলে তাকে লাশটি হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এদিকে, গত ৩০ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে বাঁশখালী উপজেলা থেকে শিশুদের বাবা মো. খোরশেদ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
৩১ ডিসেম্বর দুই শিশু সন্তানকে ফেলে যাওয়ার ঘটনায় বাবা মো. খোরশেদ আলম ও মা ঝিনুক আক্তারের বিরুদ্ধে আনোয়ারা থানার উপ-পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মোমেন কান্তি দে বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার খোরশেদ আলম বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছেন।
তিনি জানান, তাদের মূল বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি উপজেলার লেমুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মহামনি এলাকায়। পেশায় তিনি একজন অটোরিকশাচালক এবং মাঝে মাঝে বাঁশখালীতে ভাঙারির দোকানেও কাজ করতেন।
পারিবারিক বিরোধ এবং স্ত্রীর অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জেরে তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
পরবর্তীতে তিনি বাঁশখালীর মিয়ারবাজার লস্করপাড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন।
খোরশেদের অভিযোগ, প্রায় ৫ থেকে ৬ মাস আগে তার স্ত্রী ঝিনুক আক্তার দুই সন্তানকে নিয়ে ঘর থেকে পালিয়ে যান।
যাওয়ার সময় সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং নগদ প্রায় ১৮ হাজার টাকাও সঙ্গে নিয়ে যান। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় স্ত্রী ও সন্তানদের কোনও খোঁজ তিনি পাননি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, তার স্ত্রী তাদের ছোট প্রতিবন্ধি শিশুটিকে ব্যবহার করে ভিক্ষাবৃত্তি করাতেন।
বিষয়টি জানতে পেরে তিনি অতীতে বিভিন্ন জায়গায় জরিমানাও দিয়েছিলেন।
শিশুদের মায়ের বাড়ি সাতকানিয়া থানার মৌলভীর দোকান এলাকায় বলে পুলিশকে জানিয়েছেন তিনি।


