সম্প্রীতি এমনই এক সূক্ষ্ম অথচ অনিবার্য উপাদান, যা চোখে দেখা না গেলেও মনশ্চক্ষু বা অন্তরাবলোকন দিয়ে গভীরভাবে অনুভব করা যায়।
এটি কেবল শান্ত বা নীরব থাকার নাম নয়, এটি আসলে পরিচ্ছন্ন চিন্তাধারা, উভয়ের প্রতি নীতি ও আদর্শগত সাম্য এবং সর্বোপরি এক গভীর মানবিক বিবেচনাবোধের সম্মিলিত ফল।
প্রতিটি মানুষের মধ্যে যখন সহযোগিতা, আস্থা ও বিশ্বাসের হাত প্রসারিত হয় এবং সেই হাতগুলো অটুটভাবে আবদ্ধ হয়, তখনই একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে সত্যিকারের সম্প্রীতির আবহ গড়ে ওঠে।
এই আবহ জাগতিক নিয়মে এককভাবে তৈরি হয় না, এটি নিজের পরিবার থেকে শুরু হয়ে গ্রাম, সমাজ, জেলা, বিভাগ পেরিয়ে অবশেষে সমগ্র বিশ্বদরবারে জাতির পরিচয় বহন করে।
আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে, সেই প্রত্যাশা যখন নাগরিকদের মনে দানা বাঁধে, তখন সামাজিক শৃঙ্খলার মাঝে ঐক্য, প্রীতি ও মৈত্রীর বন্ধনে নিজেদের মধ্যে পূর্ণ সম্প্রীতি গড়ে তোলাটাই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু সেই পথেই আজ এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। ঠিক এমন এক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আজ দেশের প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অন্যতম বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া মৃত্যুর মুখোমুখি।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তাঁর দিনযাপন যেন দেশের রাজনৈতিক সম্প্রীতি ও বিভাজনের এক অপেক্ষার প্রতিচ্ছবি।
তিনি কত বড় উপাধিপ্রাপ্ত ব্যক্তি, তা এই চরম অসুস্থতার মধ্যে দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
বাস্তবভিত্তিক উপাধিটা হয়তো হতে পারে ‘দেশমাতৃকা’-এর উত্কৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে তিনি সর্বোচ্চ দেশপ্রেম, সততা, ঐক্য আর রাজনৈতিক সম্প্রীতির এক মূর্ত প্রতীক।
সম্প্রীতি ও দেশপ্রেমের প্রতীক খালেদা জিয়াবেগম জিয়ার জীবন শুরু হয়েছিল এক কঠিন সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে। স্বল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার স্বল্প সময়ের মধ্যেই আসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট।
স্বামী তখনকার মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যখন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তখন তিনি তাঁর দুই শিশুপুত্রসহ চরম অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর মুখে দিন যাপন করেন। সেই শুরু তাঁর কঠিন সংগ্রাম।
এরপর সামরিক পটপরিবর্তন, ১৯৭৫ সালের আগস্ট ও ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতির প্রেক্ষাপটে আসে আরো শ্বাসরুদ্ধকর জীবন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতিসত্তার প্রতিষ্ঠাতা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তক ও আধুনিক স্বনির্ভর বাংলাদেশের রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হলে খালেদা জিয়া অসময়ে স্বামীহারা হন।
স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি কেবল ব্যক্তিগত শোক বহন করেননি, বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জাতিসত্তার আদর্শ রক্ষায় রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণের গুরুভার কাঁধে তুলে নেন।
স্বৈরশাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ বছরের সংগ্রামে তাঁর নেতৃত্ব ছিল ঐক্য ও গণ-অভ্যুত্থানের প্রতীক।
১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।
প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি বাংলাদেশে নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
তাঁর সরকার অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব সাফল্য নিয়ে আসে, যা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেই সময়ের অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি পায়।
যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের টাইমস ম্যাগাজিনের কাভার প্রতিবেদন তাঁকে ‘বাংলাদেশ ইমার্জিং টাইগার’ শিরোনামে তুলে ধরে, যা ছিল দেশের অর্থনৈতিক উত্থানের এক শক্তিশালী প্রমাণ।
কিন্তু এই সাফল্য কিছু দেশি-বিদেশি কুচক্রীমহলের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুরু হয় সরকারবিরোধী আন্দোলন, যেখানে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে এক রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়।
এমনকি ‘জনতার মঞ্চ’ নামে সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একাংশের উপস্থিতি এবং সংসদ থেকে বিরোধী দলের পদত্যাগ দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে সংকটের মুখে ফেলে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও সংবিধান সংশোধনীর প্রয়োজনে ১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ মতামতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনী গৃহীত হয় এবং নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ফিরে আসে, যা ছিল রাজনৈতিক সম্প্রীতির এক ঐতিহাসিক অর্জন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ঐতিহাসিক অর্জন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালে সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে দেয়। সেই দিন থেকেই যেন বাংলাদেশ নব্য বাকশালি শাসনে ধাবিত হতে থাকে এবং রাজনৈতিক বিভাজন আরো তীব্র ও অনমনীয় হয়ে ওঠে।
বিএনপিসহ সব বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর জুলম-নিপীড়ন, গুম, হত্যা ও কারাগারে পাঠানোর অবর্ণনীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবন থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয় দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে।
তাঁঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো নির্যাতন ও নিপীড়নের মধ্যে বিদেশে মৃত্যুবরণ করেছেন। বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলায় অভিযুক্ত হয়ে লন্ডনে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে নির্বাসনে আছেন।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার ওপর নিষ্ঠুরতম আচরণ করেছেন। বাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার পর রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে ফরমায়েশি রায়ে তাঁকে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে নেওয়া হয়।
এতেও তিনি ক্ষান্ত হননি। কারাগারে বিনা চিকিৎসায় খালেদা জিয়া কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁকে কোনো উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
আজ তিনি ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং এক কঠিন জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি। প্রতিনিয়ত দেশ-বিদেশের কোটি কোটি মানুষ তাঁর জন্য দোয়া করছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাঁকে সুস্থ করে তুলতে। ইনশাআল্লাহ, তিনি সুস্থ হয়ে সবার মাঝে ফিরে আসবেন—এই আত্মবিশ্বাসে সবাই মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখছেন।
পুরো জীবনটাই যাঁর দেশের ও সমাজের জন্য সংগ্রামে জড়িত, এখনো তিনি হাসপাতালে শয্যাশায়ী হয়ে দেশের কল্যাণে ভূমিকা রাখছেন। তাইতো তিনিই সত্যিকার অর্থে ‘দেশমাতৃকা’।
তাঁর দেওয়া দেশের কল্যাণে একতাবদ্ধ হয়ে সম্প্রীতির নীতি গ্রহণ করে আমরা এগিয়ে যাব এবং ‘৩১ দফা’র ভিত্তিতে আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলব—এই প্রত্যয়ই আজ এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।কালের কণ্ঠ
শায়রুল কবির খান
লেখক : সাংস্কৃতিক কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


