দীর্ঘ ১৭টি বছর পর দেশের মাটিতে পা রেখে জুতা খুলে হেঁটেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ যেন পরম মমতায় জন্মভূমিকে স্পর্শ করছেন তিনি । মাটির সাথে দেখা হলো; মায়ের সাথে দেখা হলো; কিন্তু হলো না শুধু ঘরে ফেরা ।
দুরন্ত শৈশব কৈশোরের স্মৃতিতে ঘেরা ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের সেই ঐতিহাসিক বাড়িটিতে আর যাওয়া হলো না তারেকের। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খালেদা জিয়াকে সেই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।
২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যখন লন্ডনের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগের সময় ঐ বাড়ি থেকেই যাত্রা দিয়েছিলেন তারেক রহমান।
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের ৬ নম্বর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।
ওই ঘটনার পরদিন এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে অঝোরে কেঁদে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, “কার কাছে আমি বিচার চাইবো? দীর্ঘদিনের সংসারের সকল মালামাল রেখে আমাকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়া হলো। তারা আমার বেডরুমের দরজা ভেঙে আমাকে রীতিমতো টেনেহিঁচড়ে বের করে দিয়েছে।
পুরুষ মানুষ হয়ে বলছে, উনাকে কোলে করে তুলে নিয়ে আসেন। ধাক্কা দিয়ে আমাকে গাড়িতে তুলেছেন। আমি এর বিচারের ভার মহান আল্লাহ ও দেশবাসীর ওপর ছেড়ে দিলাম।”
ওই দিনই শেখ হাসিনা দম্ভের সঙ্গে গণমাধ্যমে বলেছিলেন, “প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ওই ক্যান্টনমেন্টে আর বসবাস করা লাগবে না। যেদিন সুযোগ পাব বের করে দেব। বের করেও দিয়েছি। শেষ!”
উচ্ছেদের কয়েক মাসের মধ্যেই শহীদ মইনুল রোডের সেই তিনতলা বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে সেখানে সেনা কর্মকর্তাদের জন্য একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়।
এর আগে ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ওই বছরের ৮ এপ্রিল সামরিক অঞ্চলে বরাদ্দে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে আওয়ামী লীগ সরকার খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দেওয়া বাড়িটির বরাদ্দ বাতিল করে।
বর্তমানে ওই এলাকায় ‘আরশি’, ‘পরশি’, ‘গাগরি’, ‘বিহঙ্গ’ ও ‘আগামী’ নামে পাঁচটি বহুতল ভবনসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে। জিয়া পরিবারের সেই ঐতিহাসিক বাড়ির আর কোনো চিহ্ন সেখানে নেই।
শহীদ মইনুল রোডের বাড়িটি ছিল জিয়াউর রহমানের স্মৃতি ঘেরা আঙিনা। ১৯৭২ সালে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জিয়াউর রহমান সপরিবারে ওই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তিনি সেখানেই ছিলেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে শাহাদাতবরণের পর তৎকালীন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বাড়িটি খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দেয়।
তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ও বেড়ে ওঠা, এমনকি তাদের সন্তানদের শৈশবের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এই বাড়ির সঙ্গে।
এ অবস্থায় দেশে ফিরে তারেক রহমান উঠছেন গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাড়িতে। বাসভবন ও দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সেখানে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছে।
বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, সেখান থেকেই তারেক রহমান দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি উচ্ছেদ ও ধ্বংসের ঘটনা আজও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হয়।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরেও শৈশবের সেই স্মৃতিবিজড়িত ঠিকানায় আর ফেরা হলো না জিয়া পরিবারের উত্তরসূরির।
ইউডি
