back to top

চট্টগ্রামে স্বর্ণ ছিনতাই-উদ্ধারে সফলতার পরও প্রশ্ন-সোয়া কোটি টাকার সোনা কই?

ঘটনা পরিকল্পিত বলেও আখ্যা কোন কোন ব্যবসায়ীর!

প্রকাশিত: ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ ১৫:০৬

চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে ৩৫ টি স্বর্ণের বার ছিনতাইয়ের কয়েকদিনের মধ্যে তা উদ্ধার এবং ছিনতাইয়ের মূল হোতাসহ চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তারের মতো বড় সফলতা দেখিয়েছে পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশের টিম।

তবে সেই সফলতার গল্পটাই এখন রহস্যময় হয়ে উঠছে কিছু স্বর্ণ মিসিং থাকায়। স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, ছিনতাই চক্রের মূল হোতাসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তারের পরও কেনো চোরাই স্বর্ণ সবটুকু উদ্ধার হলো না। বাকি সোয়া কোটি টাকার স্বর্ণ এখনো অধরা, গেল কই?

আবার কেউ কেউ মন্তব্য করছেন, ছিনতাই চক্রে খোদ প্রশাসনের সাবেক সদস্যই যখন জড়িত তখন ঘটনাটি পরিকল্পিত নয়তো? তবে এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এ ঘটনায় জড়িত আরও একজন পলাতক, তাকে গ্রেপ্তার ও বাকি স্বর্ণগুলো উদ্ধারের চেষ্ট চলছে।

গত রবিবার ৪ জানুয়ারি ভোরে কি ঘটেছিল?
এদিন ভোরে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় চড়ে প্রায় ৭ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণ নিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেনের দিকেই যাচ্ছিলেন হাজারী লেনের মিয়া শপিং মার্কেটে অবস্থিত ‘জয়রাম ট্রেডার্স’-এর কর্মী সবুজ দেবনাথ, বিভাস রায় ও পিন্টু ধর।

অটোরিকশাটি পাঁচলাইশ থানাধীন আতুরার ডিপো এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ গতিরোধ করে দুটি মোটরসাইকেলে আসা চার ছিনতাইকারী।

অস্ত্রের ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছে যা আছে সব বের করে দিতে বলেন। তবে তারা একটু সময় নেওয়া মারধরের শিকার হন।

পরে জোরপূর্বক তাদের সাথে থাকা ৩৫০ ভরি ওজনের ৩৫ স্বর্ণের বার, তিনটি মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে বাইক নিয়ে পালিয়ে যায় সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী।

এক পর্যায়ে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয়রা আহত তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। এবং পরদিন ৫ জানুয়ারি সোমবার এ ঘটনায় পাঁচলাইশ মডেল থানায় একটি মামলা করেন ভুক্তভোগী সুমন দেবনাথ।

রুদ্ধশ্বাস অভিযানে পুলিশের সাফল্য :
শুরু হয় তদন্ত। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে ছিনতাইকারীদের অবস্থান শনাক্ত করার পর পুলিশ ও ডিবি (উত্তর) বিভাগের একটি বিশেষ দল অভিযানে নামে।

গত শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) সকাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও ঢাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ছিনতাইয়ের স্বর্ণের একটি অংশ উদ্ধার ও ছয়জনকে গ্রেপ্তারের সুখবর শোনায় মহানগর পুলিশ।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্যও:
গ্রেপ্তার করা ছয়জন হলেন, পুলিশের চাকরিচ্যুত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সুমন চন্দ্র দাস (৪২), তাঁর স্ত্রী পান্না রানী দাস ওরফে দিপালী রানী দাস (৩৮), মাসুদ রানা ওরফে বাইক বাবু (৩০), রফিকুল ইসলাম ওরফে ইমন (২২), রবি কুমার দাস (৪০) ও তথ্যদাতা বিবেক বণিক (৪২)। বিবেক বনিক হাজারী গলির স্বর্ণ ব্যবসায়ী।

সংবাদ সম্মেলনে নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম যা বলেন:
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) বিকেলে পাঁচলাইশ মডেল থানায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিএমপির উপ-কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান জানান, স্বর্ণের দোকানের তিন কারিগরকে মারধর করে ৩৫টি স্বর্ণের বার ছিনতাইয়ের অভিযোগ পাওয়ার পর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি দল গঠন করা হয়।স্বর্ণ

দলটি গত তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে অপরাধীদের অবস্থান শনাক্তের পর গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের কাশিমপুরের মাধবপুর এলাকায় অভিযান চালায়। অভিযানে সুমন, ইমন ও বাইক বাবুকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্য সুমনের স্বীকারোক্তি:
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন চন্দ্র দাস জানান, তার নেতৃত্বেই পরিকল্পিতভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। লুণ্ঠিত সোনার বারগুলো প্রথমে তার স্ত্রী পান্না রানী দাস ওরফে দিপালী রানী দাস এবং পরে চাচাতো ভাই রবি কুমার দাসের কাছে রাখা হয়।

পরে ওইদিন বিকেলেই ঢাকার রায়েরবাজার এলাকা থেকে রবি দাশকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এরপর দিন সুমনের দেওয়া তথ্যমতে পুলিশ তার স্ত্রী পান্না রানী দাস ওরফে দীপালী রানী দাসকে চট্টগ্রামের হালিশহরের বাসা থেকে এবং গোপন তথ্যদাতা হিসেবে বিবেক বনিককে (৪২) কোতোয়ালি থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

পরে গ্রেপ্তার সকলে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজার এলাকায় একটি বাসা থেকে একটি বাক্সের ভেতর মোড়ানো অবস্থায় ২৯টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি বারের গায়ে ইংরেজিতে ‘sam 10 TOLAS GOLD 999.0’ লেখা ছিল।

সাবেক পুলিশ সদস্য সুমনের বিষয়ে কী বলছেন সিএমপির উপকমিশনার হাবিবুর রহমান?
তিনি বলেন, ‘ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধকর্মে জড়ানোর কারণে সুমনকে বিভাগীয় শাস্তির আওতায় পুলিশ বাহিনী থেকে স্থায়ী বরখাস্ত করা হয়েছিল। সে জেলেও গিয়েছিল। কিন্তু জেল খেকে বেরিয়ে এখন একটি পেশাদার ছিনতাইকারী সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছে।’

সবকিছুই স্বীকার করেছে কিন্তু ৬০ ভরি স্বর্ণের তথ্য কোথায়?
ছিনতাই হয়েছে ৭ কোটি টাকার ৩৫০ ভরি স্বর্ণ, আর উদ্ধার হয়েছে ৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা মূল্যের ২৯০ ভরি। বাকি সোয়া কোটি টাকা মূল্যের ৬০ ভরি স্বর্ণের কোন হদিস না মেলায় হাজারী লেইনের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানান মিশ্র মন্তব্য শোনা যাচ্ছে।

তাছাড়া স্বর্ণ বহনের কৌশলের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মোড়কের ধরনেও ভিন্নতা নিয়েও মন্তব্য করছেন অনেকেই। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন ঘটনাটি পরিকল্পিত নয়তো?

গায়েব/উধাও বা নিখোঁজ স্বর্ণের বিষয়ে অস্পষ্টতা না কাটার বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য হলো এ ঘটনায় জড়িত আরও একজন পলাতক রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তার নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। তাকে গ্রেপ্তার ও বাকি স্বর্ণগুলো উদ্ধারের চেষ্ট চলছে। আশা করছি শীঘ্রই উদ্ধারের পর পুনরায় সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি স্পষ্ট করা হবে।

নিবিড় পর্যবেক্ষণে প্রশাসন: 
সম্প্রতি ৭ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণ ছিনতাই, উদ্ধার, ও ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারের ঘটনাটিতেও পরিকল্পনার গন্ধ খুঁজছে অনেক ব্যবসায়ী। তবে প্রশাসনও ঘটনাটি এখন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে।